
বাংলাদেশে অনলাইন ব্যবসার বড় একটা অংশ শুরু হয়েছে ফেসবুক পেজ থেকে। একটা পেজ খোলা, কয়েকটা প্রোডাক্টের ছবি দেওয়া, একটু বুস্ট করা, আর ইনবক্সে অর্ডার নেওয়া। খরচ কম, কাস্টমারও সেখানেই আছেন। শুরু করার জন্য এর চেয়ে সহজ উপায় খুব কমই আছে।
কিন্তু বিক্রি বাড়তে থাকলে একটা সময় আসে যখন পেজটা আর ব্যবসাকে সামলাতে পারে না। ইনবক্স ভরে যায়, অর্ডারের হিসাব গোলমাল হয়, কুরিয়ারে এন্ট্রি দিতে দিতে দিন শেষ। তখন প্রশ্নটা আসে: এখন কি নিজের একটা ই-কমার্স ওয়েবসাইট দরকার?
এই লেখায় সেটাই পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছি। কখন ওয়েবসাইট দরকার, কখন এখনো দরকার নেই, আর বানালে কী কী থাকা জরুরি।
ফেসবুক পেজ দিয়ে শুরু করা ভুল ছিল না
শুরুতেই একটা কথা বলে রাখি। এফ-কমার্স কোনো ছোট বা কম গুরুত্বের ব্যবসা না। দেশের অনেক পরিচিত ব্র্যান্ড এভাবেই শুরু করেছে। পেজে কাস্টমারের সাথে সরাসরি কথা বলা যায়, লাইভে প্রোডাক্ট দেখানো যায়, আর নতুন প্রোডাক্ট বাজারে চলবে কিনা সেটা কম খরচে যাচাই করা যায়।
সমস্যা পেজে না। সমস্যা হয় যখন পুরো ব্যবসাটা শুধু একটা পেজ আর একটা ইনবক্সের উপর দাঁড়িয়ে থাকে।
যে লক্ষণগুলো দেখলে বুঝবেন পেজ একা আর পারছে না
ইনবক্সে একই প্রশ্ন বারবার
"প্রাইস?" "সাইজ আছে?" "ঢাকার বাইরে ডেলিভারি চার্জ কত?" দিনে শত শত মেসেজ, আর তার বেশিরভাগই একই প্রশ্ন। একজন বা দুজন মডারেটর সারাদিন শুধু এগুলোর উত্তর দিচ্ছেন। রাত বারোটায় কেউ মেসেজ দিলে উত্তর পান সকালে, ততক্ষণে উনি হয়তো অন্য পেজ থেকে কিনে ফেলেছেন।
অর্ডার লেখা হচ্ছে খাতায় বা এক্সেলে
কাস্টমারের নাম, ফোন নম্বর, ঠিকানা, সাইজ, কালার, সব হাতে লিখে রাখতে হচ্ছে। একটা নম্বর ভুল হলে পার্সেল ফেরত আসে। একটা সাইজ ভুল হলে এক্সচেঞ্জ, মানে দুবার ডেলিভারি চার্জ। অর্ডার যত বাড়ে, এই ছোট ভুলগুলোর খরচও তত বাড়ে।
কুরিয়ারে প্রতিটা পার্সেল হাতে এন্ট্রি দিতে হচ্ছে
Steadfast, Pathao বা RedX এর প্যানেলে প্রতিটা অর্ডার আলাদা করে কপি-পেস্ট করে বসানো। দিনে দশটা অর্ডারে এটা চলে যায়। দিনে পঞ্চাশটা হলে শুধু এন্ট্রি দিতেই কয়েক ঘণ্টা চলে যায়, আর ভুলের সম্ভাবনাও বাড়ে।
ফেক অর্ডার আর রিটার্নে লস
ক্যাশ অন ডেলিভারিতে অর্ডার দিয়ে ফোন বন্ধ, অথবা পার্সেল নিতে অস্বীকার। প্রতিটা রিটার্নে দুই দিকের ডেলিভারি চার্জ আপনার পকেট থেকে যায়। ইনবক্সে অর্ডার নিলে কোন নম্বর আগেও এমন করেছে, সেটা মনে রাখার কোনো সহজ উপায় থাকে না।
পেজ রেস্ট্রিক্ট হলে সব বন্ধ
পেজ হ্যাক হওয়া, অ্যাড অ্যাকাউন্ট ডিজেবল হওয়া, বা হঠাৎ রিচ কমে যাওয়া, এগুলো অনেকেরই হয়েছে। যদি পুরো ব্যবসা একটা পেজের উপর নির্ভর করে, তাহলে সেই কয়েকদিন বিক্রি প্রায় শূন্য। কাস্টমারের লিস্টও তখন আপনার হাতে থাকে না।
বুস্ট বন্ধ করলে বিক্রিও বন্ধ
ফেসবুকে বিক্রি অনেকটাই অ্যাডের উপর চলে। অ্যাড বন্ধ করলে নতুন কাস্টমার আসাও কমে যায়। অথচ প্রতিদিন অনেক মানুষ গুগলে "পাঞ্জাবি অনলাইন", "মেয়েদের থ্রি পিস" বা "অর্গানিক মধু কোথায় পাব" লিখে সার্চ করছেন। শুধু পেজ থাকলে এই কাস্টমারদের কাছে আপনি পৌঁছাতে পারবেন না।
এর মধ্যে দুই বা তিনটা লক্ষণ যদি আপনার ব্যবসার সাথে মিলে যায়, তাহলে ওয়েবসাইট নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবার সময় হয়েছে।
ওয়েবসাইট থাকলে আসলে কী বদলায়
ওয়েবসাইট কোনো জাদু না। কিন্তু উপরের সমস্যাগুলোর বেশিরভাগই এতে অনেকটা কমে আসে।

একই প্রশ্নের উত্তর আর বারবার দিতে হয় না। প্রতিটা প্রোডাক্ট পেজে দাম, সাইজ, স্টক আর ডেলিভারি চার্জ লেখা থাকে। কাস্টমার নিজেই দেখে নেন।
কাস্টমার নিজেই অর্ডার করেন, দিন হোক বা রাত। নাম, নম্বর আর ঠিকানা উনি নিজেই লেখেন। ফোন নম্বর ঠিক আছে কিনা, সেটাও সাইট যাচাই করে নিতে পারে।
অর্ডার সরাসরি ড্যাশবোর্ডে আসে। সেখান থেকে এক ক্লিকে কুরিয়ারে পাঠানো যায়। হাতে এন্ট্রির ঝামেলা থাকে না।
কাস্টমারের তথ্য আপনার কাছে থাকে। কে কতবার কিনেছেন, কে বারবার পার্সেল ফেরত দিয়েছেন, সব দেখা যায়। নতুন কালেকশন এলে পুরনো কাস্টমারদের SMS পাঠানো যায়।
ফেসবুক অ্যাড আরও ভালো কাজ করে। Meta Pixel আর Conversions API ঠিকভাবে সেটআপ থাকলে ফেসবুক বুঝতে পারে কারা আসলে কিনছেন। ফলে একই বাজেটে অ্যাড সাধারণত আরও সঠিক মানুষের কাছে যায়।
গুগল থেকে কাস্টমার আসে। ভালোভাবে বানানো প্রোডাক্ট আর ক্যাটাগরি পেজ ধীরে ধীরে সার্চে আসতে শুরু করে। এই কাস্টমাররা অ্যাড ছাড়াই আসেন।
ওয়েবসাইট মানে ফেসবুক ছেড়ে দেওয়া না
অনেকে ভাবেন ওয়েবসাইট বানালে পেজের আর দরকার নেই। আসলে ব্যাপারটা উল্টো। সবচেয়ে ভালো ফল আসে দুটো একসাথে চালালে।
পেজে আগের মতোই পোস্ট আর লাইভ চলবে, কিন্তু প্রতিটা পোস্টে প্রোডাক্টের সরাসরি লিংক থাকবে। লাইভে কাস্টমার পছন্দ করলে লিংকে গিয়ে নিজেই অর্ডার করবেন। ইনবক্স থাকবে সেইসব প্রশ্নের জন্য যেগুলোতে সত্যিই মানুষের উত্তর দরকার, যেমন কাপড়ের মান বা গিফট র্যাপিং। পেজ কাস্টমার নিয়ে আসবে, আর অর্ডারের কাজটা সামলাবে ওয়েবসাইট।
কখন এখনই ওয়েবসাইট দরকার নেই
সব অনলাইন শপের এখনই ওয়েবসাইট লাগবে, এমন না। কিছু ক্ষেত্রে অপেক্ষা করাই ভালো:
আপনি সবে শুরু করেছেন, এখনো বোঝার চেষ্টা করছেন কোন প্রোডাক্ট চলে
দিনে হাতে গোনা কয়েকটা অর্ডার আসে, আর ইনবক্স সহজেই সামলানো যাচ্ছে
প্রোডাক্ট প্রতি সপ্তাহে পুরোপুরি বদলে যায়, আর প্রতিটা আইটেম একটা-দুটো করে থাকে
এই অবস্থায় টাকাটা প্রোডাক্ট, ভালো ছবি আর মার্কেটিংয়ে খরচ করা বেশি কাজের। অর্ডার নিয়মিত হয়ে গেলে, আর অর্ডার সামলাতেই যখন দিনের বড় একটা সময় চলে যায়, তখন ওয়েবসাইটের খরচ নিজেই উঠে আসে।
বাংলাদেশি অনলাইন শপের ওয়েবসাইটে যা অবশ্যই থাকা দরকার
বিদেশি ই-কমার্স টেমপ্লেট দেখতে সুন্দর হয়, কিন্তু বাংলাদেশে কেনাকাটা যেভাবে হয় তার সাথে অনেক সময় মেলে না। ওয়েবসাইট বানানোর সময় এগুলো খেয়াল রাখুন:
ক্যাশ অন ডেলিভারি, সাথে বিকাশ বা নগদে পেমেন্টের অপশন
ঢাকার ভেতরে আর বাইরে আলাদা ডেলিভারি চার্জ, যেটা চেকআউটে নিজে থেকেই হিসাব হবে
সহজ চেকআউট। অ্যাকাউন্ট খোলা বাধ্যতামূলক না, শুধু নাম, ফোন নম্বর আর ঠিকানা দিলেই অর্ডার হয়ে যাবে
কুরিয়ার ইন্টিগ্রেশন, যাতে অর্ডার সরাসরি Steadfast, Pathao বা RedX এ চলে যায়
সন্দেহজনক অর্ডার ধরার ব্যবস্থা। যেমন আগের রিটার্ন হিস্টোরি দেখা, বা ঝুঁকিপূর্ণ অর্ডারে ডেলিভারি চার্জ অগ্রিম নেওয়া
অর্ডার কনফার্মেশন SMS, যাতে কাস্টমার নিশ্চিত থাকেন অর্ডারটা হয়েছে
মোবাইলে দ্রুত লোড হওয়া। আপনার বেশিরভাগ কাস্টমার ফেসবুক থেকে ফোনে, মোবাইল ডেটায় আসবেন
Messenger বা WhatsApp বাটন, যাদের কেনার আগে একটু কথা বলা দরকার তাদের জন্য
Meta Pixel আর Conversions API, যাতে ফেসবুক অ্যাড ঠিকমতো মাপা যায়
Shopify, WooCommerce নাকি কাস্টম ওয়েবসাইট?
এটা নিয়ে আলাদা একটা লেখা লেখা যায়, তবে ছোট করে বলি।
Shopify চালানো সহজ, কিন্তু মাসিক খরচ ডলারে দিতে হয়, আর বাংলাদেশি পেমেন্ট ও কুরিয়ারের জন্য অনেক সময় বাড়তি অ্যাপ লাগে। WooCommerce অনেক ফ্লেক্সিবল, লোকাল প্লাগিনও পাওয়া যায়, কিন্তু নিয়মিত আপডেট আর দেখভাল দরকার, নাহলে ধীর বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। বাংলাদেশের জন্য বানানো প্ল্যাটফর্ম বা কাস্টম সাইট শুরু থেকেই লোকাল কুরিয়ার, ক্যাশ অন ডেলিভারি আর বিকাশ-নগদ মাথায় রেখে বানানো হয়, তাই বাড়তি জোড়াতালি কম লাগে।
কোনটা ভালো, সেটা নির্ভর করে আপনার প্রোডাক্টের সংখ্যা, অর্ডারের পরিমাণ আর টিমের উপর। প্ল্যাটফর্ম বাছাইয়ের আগে নিজের অর্ডারের পুরো প্রসেসটা একবার কাগজে লিখে ফেলুন, মানে অর্ডার আসা থেকে ডেলিভারি পর্যন্ত। তারপর দেখুন কোন প্ল্যাটফর্ম সেই প্রসেসের সাথে সবচেয়ে ভালো মেলে।
অনেকে যা জানতে চান
একটা ই-কমার্স ওয়েবসাইট বানাতে কত খরচ হয়?
প্রোডাক্টের সংখ্যা, কী কী ফিচার লাগবে আর কোন প্ল্যাটফর্মে বানানো হবে, তার উপর অনেকটা নির্ভর করে। শুধু বানানোর খরচ না, প্রতি বছরের ডোমেইন, হোস্টিং, SMS আর মেইনটেন্যান্স খরচও আগে থেকে জেনে নিন।
ওয়েবসাইট থাকলে কি আর ফেসবুক বুস্ট লাগবে না?
লাগবে, অন্তত শুরুতে। ওয়েবসাইট মার্কেটিংয়ের বিকল্প না। তবে ওয়েবসাইট থাকলে অ্যাডের ফল ভালোভাবে মাপা যায়, আর সময়ের সাথে গুগল আর পুরনো কাস্টমারদের থেকে অ্যাড ছাড়াও বিক্রি আসতে থাকে।
ওয়েবসাইটে কি ক্যাশ অন ডেলিভারি রাখা যায়?
হ্যাঁ। বাংলাদেশের বেশিরভাগ ই-কমার্স ওয়েবসাইটেই ক্যাশ অন ডেলিভারি প্রধান পেমেন্ট অপশন। চাইলে এর সাথে বিকাশ, নগদ বা কার্ড পেমেন্টও রাখা যায়।
কুরিয়ার সার্ভিসের সাথে ওয়েবসাইট কানেক্ট করা যায়?
যায়। Steadfast, Pathao, RedX সহ বড় কুরিয়ার সার্ভিসগুলো মার্চেন্টদের জন্য API দেয়। ঠিকভাবে কানেক্ট করা থাকলে ওয়েবসাইট থেকেই পার্সেল বুক করা যায়, আর ডেলিভারির স্ট্যাটাসও দেখা যায়।
ফেসবুক পেজের কাস্টমারদের কি ওয়েবসাইটে আনা কঠিন?
শুরুতে কিছু কাস্টমার ইনবক্সেই অর্ডার করতে চাইবেন, সেটা স্বাভাবিক। পোস্টে সরাসরি প্রোডাক্টের লিংক দিলে আর চেকআউট সহজ রাখলে বেশিরভাগ মানুষ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অভ্যস্ত হয়ে যান।
Grayshaper চট্টগ্রাম থেকে বাংলাদেশি অনলাইন শপের জন্য ই-কমার্স ওয়েবসাইট বানায়, লোকাল পেমেন্ট আর কুরিয়ার মাথায় রেখে। আপনার পেজ থেকে ওয়েবসাইটে যাওয়ার কথা ভাবলে একটা কল বুক করুন। আপনার এখনকার অর্ডার প্রসেস দেখে আমরা বলে দেব কোন পথটা আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো।



