
আমাদের কাছে প্রায়ই একটা মেসেজ আসে। কথাগুলো একটু এদিক-সেদিক হয়, কিন্তু গল্পটা একই: "আমাদের ওয়েবসাইটটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে। যিনি বানিয়েছিলেন, ওনার সাথে আর যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। ডোমেইনটাও ওনার অ্যাকাউন্টে।"
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমস্যাটা ডিজাইন বা কোডে না। সমস্যা শুরু হয়েছিল কাজ শুরুর আগেই, যখন কয়েকটা সহজ প্রশ্ন কেউ করেননি। দাম নিয়ে কথা হয়েছে, ডিজাইন কেমন হবে সেটা নিয়ে কথা হয়েছে। কিন্তু ডোমেইন কার নামে থাকবে, বা এক বছর পর রিনিউ খরচ কত, এসব নিয়ে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করেননি।
বাংলাদেশে ব্যবসার জন্য ওয়েবসাইট তৈরি করার কথা ভাবলে, ফ্রিল্যান্সার বা ওয়েব ডিজাইন এজেন্সি যাকে দিয়েই করান, নিচের প্রশ্নগুলো আগে করে নিন। উত্তর শুনেই অনেকটা বুঝে যাবেন কার সাথে কাজ করা নিরাপদ।
১. ডোমেইনটা কার নামে, কার অ্যাকাউন্টে রেজিস্টার হবে?
এটাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন। আর মজার ব্যাপার হলো, এটাই সবচেয়ে কম মানুষ জিজ্ঞেস করেন।
অনেক ডেভেলপার সুবিধার জন্য ক্লায়েন্টের ডোমেইন নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে কিনে দেন। শুরুতে এতে কোনো সমস্যা মনে হয় না। কিন্তু পরে সম্পর্ক খারাপ হলে, বা উনি অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলে, আপনার ব্যবসার নামের ডোমেইনটা আসলে আপনার হাতে থাকে না। সময়মতো রিনিউ না হলে ডোমেইন এক্সপায়ার হয়ে যায়। আর ভালো নামের ডোমেইন অন্য কেউ কিনে নিতে খুব বেশি সময় লাগে না।
যা চাইবেন:
ডোমেইন রেজিস্ট্রারে (Namecheap, Cloudflare বা কোনো লোকাল প্রোভাইডার) আপনার নিজের ইমেইল দিয়ে খোলা একটা অ্যাকাউন্ট
রেজিস্ট্র্যান্ট হিসেবে আপনার বা আপনার প্রতিষ্ঠানের নাম
ডেভেলপারের দরকার হলে উনি আলাদা অ্যাক্সেস নিয়ে কাজ করবেন, কিন্তু মালিকানা থাকবে আপনার
.com.bd ডোমেইন নিলেও একই কথা। কাগজপত্র আপনার প্রতিষ্ঠানের নামেই জমা দিন।
২. ওয়েব হোস্টিং কোথায়, আর তার লগইন কি আমার কাছে থাকবে?
বছরে কয়েকশো টাকার হোস্টিং প্যাকেজ বাজারে অনেক আছে। ছোট একটা সাইটের জন্য সবসময় দামি হোস্টিং লাগবে, এমনও না। কিন্তু খুব সস্তা শেয়ার্ড হোস্টিংয়ে একই সার্ভারে শত শত সাইট রাখা থাকে। ফলে সাইট ধীরে লোড হয়, মাঝে মাঝে ডাউন থাকে, আর সাপোর্টে মেসেজ দিলে উত্তর আসতে দিন পার হয়ে যায়।
জিজ্ঞেস করুন কোন কোম্পানির হোস্টিং, সার্ভার কোন দেশে, আর ব্যাকআপ কত দিন পরপর নেওয়া হয়। হোস্টিংয়ের cPanel বা ড্যাশবোর্ডের লগইন নিজের কাছে রাখুন। নিজে কখনো না ঢুকলেও সমস্যা নেই। শুধু দরকারের দিন যেন পাসওয়ার্ডের জন্য কারো উপর নির্ভর করতে না হয়।
৩. থিম আর প্লাগিনগুলো কি লাইসেন্স করা?
ওয়ার্ডপ্রেস সাইটে এই সমস্যাটা খুবই কমন। প্রিমিয়াম থিম বা প্লাগিনের "nulled" ভার্সন, মানে ক্র্যাক করা কপি, ইন্টারনেটে ফ্রিতে পাওয়া যায়। খরচ কমাতে কিছু ডেভেলপার এগুলো ব্যবহার করেন।
সমস্যা হলো, এসব ফাইলে অনেক সময় লুকানো ম্যালওয়্যার থাকে। কয়েক মাস পর দেখা যায় সাইটে অদ্ভুত লিংক ঢুকে গেছে, গুগলে আপনার সাইটের নামের নিচে জুয়া বা ওষুধের বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছে, অথবা ব্রাউজার সাইট খোলার আগেই ওয়ার্নিং দিচ্ছে। তাছাড়া nulled প্লাগিন আপডেট হয় না, তাই সিকিউরিটির ফাঁকগুলোও থেকে যায়।
সরাসরি জিজ্ঞেস করুন কোন থিম আর কোন প্লাগিন ব্যবহার হবে, আর লাইসেন্স কার নামে কেনা হবে। কোটেশনে লাইসেন্সের খরচ আলাদা করে লেখা থাকলে সেটা ভালো লক্ষণ।
৪. সাধারণ একটা অ্যান্ড্রয়েড ফোনে, মোবাইল ডেটায় সাইটটা কেমন চলবে?
বাংলাদেশে আপনার ভিজিটরদের বড় অংশই আসবেন মোবাইল থেকে। আর সবার হাতে নতুন দামি ফোন নেই, সবাই ওয়াইফাইতেও থাকেন না। অফিসের ল্যাপটপে ব্রডব্যান্ডে যে সাইট দুই সেকেন্ডে খোলে, সেটাই একটা সাধারণ ফোনে 4G তে আট-দশ সেকেন্ড নিতে পারে। এতক্ষণ বেশিরভাগ মানুষ অপেক্ষা করেন না, ব্যাক করে পরের সাইটে চলে যান।

ডেমো দেখার সময় তাই শুধু ডেভেলপারের স্ক্রিনে দেখে সন্তুষ্ট হবেন না। নিজের ফোনে ওয়াইফাই বন্ধ করে, মোবাইল ডেটায় খুলে দেখুন। বড় স্লাইডার, অটোপ্লে ভিডিও আর অনেক অ্যানিমেশন দেখতে সুন্দর লাগে, কিন্তু এর দাম দিতে হয় স্পিড দিয়ে।
চাইলে Google PageSpeed Insights (pagespeed.web.dev) এ সাইটের লিংক দিয়ে মোবাইল স্কোরটাও দেখে নিতে পারেন। স্কোরই সব না, তবে লাল রঙে খুব কম নম্বর এলে প্রশ্ন করার পুরো অধিকার আপনার আছে।
৫. ওয়েবসাইটে বিকাশ, নগদ বা কার্ড পেমেন্ট কীভাবে, কতদিনে চালু হবে?
ই-কমার্স সাইট বা অনলাইনে বুকিং নেওয়ার সাইট হলে এই প্রশ্নটা একদম শুরুতে করুন। অনেকে ভাবেন সাইট রেডি হলেই বিকাশ, নগদ বা কার্ড পেমেন্ট চালু হয়ে যাবে। বাস্তবে SSLCommerz, বিকাশ মার্চেন্ট বা নগদ মার্চেন্টের মতো পেমেন্ট গেটওয়ে চালু করতে আলাদা আবেদন করতে হয়। সাধারণত ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট লাগে, আর ওয়েবসাইটে রিফান্ড পলিসি, প্রাইভেসি পলিসি ও যোগাযোগের তথ্যের মতো কিছু পেজ থাকতে হয়। অনুমোদন পেতেও কিছু সময় লাগে।
তাই ডিজাইনের কাজ চলার সময়েই কাগজপত্র গোছানো শুরু করুন। নাহলে লঞ্চের দিন দেখবেন সবকিছু রেডি, শুধু পেমেন্ট নেওয়া যাচ্ছে না। মাঝের সময়টা ক্যাশ অন ডেলিভারি বা ম্যানুয়াল বিকাশ নম্বর দিয়ে চালানো যায়, কিন্তু সেটাও আগে থেকে ঠিক করে রাখা ভালো।
৬. ওয়েবসাইটে বাংলা লেখা ঠিকমতো দেখাবে তো? (বিজয় বনাম ইউনিকোড)
শুনতে ছোট বিষয় মনে হয়, কিন্তু অনেক সাইটে এটাই ঝামেলা বাধায়।
প্রথম সমস্যা বিজয় আর ইউনিকোড নিয়ে। অনেক অফিসে এখনো বিজয় কিবোর্ডে, ANSI ফন্টে টাইপ করা হয়। সেই লেখা কপি করে ওয়েবসাইটে বসালে হয় ভাঙা অক্ষর দেখায়, নয়তো দেখতে ঠিক লাগলেও গুগল সেটাকে বাংলা হিসেবে পড়তে পারে না। ফলে কেউ বাংলায় সার্চ করলে আপনার পেজ আসে না। ওয়েবসাইটের সব বাংলা কনটেন্ট ইউনিকোডে হওয়া দরকার। কনটেন্ট পাঠানোর আগে অভ্র বা কোনো ইউনিকোড কনভার্টার দিয়ে ঠিক করে নিন, অথবা ডেভেলপারকে জিজ্ঞেস করুন উনি এটা সামলাবেন কিনা।
দ্বিতীয় সমস্যা ফন্ট। কিছু বাংলা ওয়েব ফন্টের ফাইল বেশ ভারী, সাইট ধীর করে দেয়। আবার কিছু ফন্টে যুক্তাক্ষর ঠিকমতো আসে না, "ক্ষ" বা "ন্ত্র" এর মতো অক্ষর ভেঙে অদ্ভুত দেখায়। ডেমো সাইটে নিজের প্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকানা আর কয়েকটা যুক্তাক্ষরওয়ালা শব্দ বসিয়ে মোবাইলে একবার দেখে নিন।
৭. লঞ্চের পর কে দেখবে, আর পরের বছর খরচ কত?
কোটেশনে সাধারণত শুধু ওয়েবসাইট বানানোর খরচ লেখা থাকে। কিন্তু ওয়েবসাইট একবার বানিয়ে ফেলে রাখার জিনিস না। প্রতি বছর কিছু খরচ আসবেই:
ডোমেইন রিনিউ। অনেক ডোমেইন প্রথম বছর অফারে কম দামে পাওয়া যায়, দ্বিতীয় বছর থেকে রিনিউ খরচ বেশি। দুটো দামই আগে জেনে নিন।
হোস্টিং রিনিউ। একই ব্যাপার। প্রথম বছরের প্রোমো প্রাইস দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না।
লাইসেন্স রিনিউ। অনেক প্রিমিয়াম প্লাগিন বছর বছর রিনিউ করতে হয়।
আপডেট আর ব্যাকআপ। কে করবে, মাসে কত খরচ, নাকি আপনাকেই করতে হবে?
আরেকটা প্রশ্ন অবশ্যই করবেন: দাম আপডেট করা, নতুন ছবি দেওয়া, অফারের ব্যানার বদলানো, এই ধরনের ছোট কাজ কি আমি নিজে করতে পারব? প্রতিটা ছোট পরিবর্তনের জন্য যদি ডেভেলপারকে মেসেজ দিয়ে বসে থাকতে হয়, সাইটটা ধীরে ধীরে পুরনো তথ্যে ভরে যায়। লঞ্চের পর আধা ঘণ্টার একটা ট্রেনিং বা ছোট একটা ভিডিও গাইড চেয়ে নিন।
৮. গুগলে খুঁজে পাওয়ার জন্য আসলে কী কী SEO করা হবে?
"SEO friendly" কথাটা এখন প্রায় সব কোটেশনেই লেখা থাকে। কিন্তু ঠিক কী করা হবে জানতে চাইলে অনেক সময় পরিষ্কার উত্তর পাওয়া যায় না।
একটা স্থানীয় ব্যবসার সাইটে অন্তত এগুলো থাকা উচিত:
প্রতিটা পেজের আলাদা টাইটেল আর মেটা ডেসক্রিপশন
প্রতিটা সার্ভিসের জন্য আলাদা পেজ, সব এক পেজে গাদাগাদি করে না
ঠিকানা, ফোন নম্বর আর খোলার সময় সাইটে লেখা, আর সেটা আপনার Google Business Profile এর তথ্যের সাথে হুবহু মিলবে
Google Search Console সেটআপ, যাতে বোঝা যায় মানুষ কোন শব্দ লিখে আপনার সাইটে আসছেন
LocalBusiness schema markup, যেটা গুগলকে আপনার ব্যবসার তথ্য সহজে বুঝতে সাহায্য করে
এর বেশি কিছু হলে ভালো। কিন্তু এর চেয়ে কম হলে "SEO friendly" কথাটার খুব একটা মানে থাকে না।
উত্তর শুনে কী বুঝবেন
একজন ভালো ডেভেলপার বা এজেন্সি এই প্রশ্নগুলো শুনে বিরক্ত হন না। বরং খুশিই হন, কারণ এতে পরে ভুল বোঝাবুঝি কম হয়। উত্তরগুলো পরিষ্কার হবে, আর বেশিরভাগ বিষয় কোটেশন বা চুক্তিতে লিখে দিতে তাদের আপত্তি থাকবে না।
উল্টোদিকে, কেউ যদি বলেন "ওসব নিয়ে আপনার চিন্তা করতে হবে না, আমি দেখে নেব", আর কোনো অ্যাক্সেস দিতে চান না, তাহলে একটু সাবধান হওয়াই ভালো। শুধু কম দাম দেখে নেওয়া সিদ্ধান্ত পরে অনেক সময় বেশি খরচের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অনেকে যা জানতে চান
বাংলাদেশে ওয়েবসাইট তৈরি করতে কত খরচ হয়?
কাজের ধরনের উপর অনেকটা নির্ভর করে। কয়েক পেজের একটা তথ্যভিত্তিক সাইট আর পেমেন্টসহ একটা ই-কমার্স সাইটের খরচ এক হবে না। তুলনা করার সময় শুধু মোট দাম দেখবেন না। দেখুন কোটেশনে ডোমেইন, হোস্টিং, লাইসেন্স, কনটেন্ট আপলোড আর লঞ্চের পরের সাপোর্ট ধরা আছে কিনা।
ফেসবুক পেজ থাকলে কি আলাদা ওয়েবসাইট লাগে?
ফেসবুক পেজ অবশ্যই কাজের, কিন্তু সেটা পুরোপুরি আপনার নিয়ন্ত্রণে না। অ্যালগরিদম বদলালে রিচ কমে যায়, পেজ রেস্ট্রিক্ট হলে সব আটকে যায়। আর কেউ গুগলে আপনার সার্ভিস খুঁজলে সাধারণত ওয়েবসাইটই সামনে আসে। দুটো একসাথে চালানোই সবচেয়ে ভালো।
.com নেব নাকি .com.bd?
কাস্টমার যদি শুধু বাংলাদেশের হন, .com.bd ভালো অপশন, স্থানীয় ব্যবসা হিসেবে একটা বিশ্বাসযোগ্যতাও দেয়। দেশের বাইরের কাস্টমার থাকলে .com সাধারণত সহজ। সম্ভব হলে দুটোই নিয়ে একটা থেকে আরেকটায় রিডাইরেক্ট করে রাখতে পারেন।
একটা ওয়েবসাইট তৈরি করতে কতদিন লাগে?
ছোট একটা সাইট সাধারণত কয়েক সপ্তাহের কাজ। তবে দেরিটা বেশিরভাগ সময় হয় কনটেন্টের কারণে, মানে লেখা আর ছবি সময়মতো না পাওয়ায়। কাজ শুরুর আগেই আপনার সার্ভিসের তালিকা, ভালো কিছু ছবি আর বেসিক লেখাগুলো গুছিয়ে রাখলে অনেক সময় বাঁচে।
Grayshaper চট্টগ্রাম থেকে কাজ করে। কাজ শুরুর আগেই আমরা ফিক্সড কোটেশন দিই, আর ওপরের প্রশ্নগুলোর উত্তরও তখনই পরিষ্কার করে নিই। আপনার ওয়েবসাইট নিয়ে কথা বলতে চাইলে একটা কল বুক করুন। বাংলা বা ইংরেজি, যেটায় আপনার সুবিধা।



